সেমিনারে গভর্নরের দাবি

আইএমএফের সহায়তা ছাড়াই চলতি অর্থবছরে রিজার্ভ হবে ৩৫ বিলিয়ন ডলার

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যেই দেশের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার হবে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যেই দেশের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার হবে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই দেশের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার হয়ে যাবে আশা করি। আর তা হবে আইএমএফের অর্থ সহায়তা ছাড়াই।’

রাজধানীর গুলশানে গতকাল এক সেমিনারে এ কথা বলেন গভর্নর। ‘‌সিস্টেমেটিক ইফোর্টস টু আন্ডারস্ট্যান্ড ইকোমিক পাল্স: ইম্পোর্ট্যান্স অব পার্চেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই)’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। পিএমআই সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর বলেন, ‘রফতানি খাত এ মুহূর্তে আমাদের একটি দুর্বল জায়গা। তবে সৌভাগ্যবশত বৈশ্বিক আমদানি মূল্য কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় আমরা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছি। আমদানি ব্যয় ৫-৬ শতাংশ হয়তো বেড়েছে, তবে একই সঙ্গে আমদানির পরিমাণও বেড়েছে। ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতিও নাজুক ছিল। আমরা সেই কঠিন অবস্থাও পার করে এসেছি। বিপুল পরিমাণ বিদেশী দায় মিটিয়েছি।’

ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ডিসেম্বরে আমানত প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রত্যাশা ছিল ১৪ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধির উৎসের জন্য আমরা টাকা ছাপাইনি। এ অর্থ এসেছে মূলত ব্যালান্স অব পেমেন্টস উদ্বৃত্তের কারণে। নিট বৈদেশিক সম্পদ বৃদ্ধিই অর্থ সরবরাহ তৈরি করেছে। এ প্রবৃদ্ধি অবশ্যই সুদহার কমাতে সাহায্য করবে। কারণ ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে বাধ্য হবে। গত বছর সরকারি খাতে অনেক ঋণ দিয়েছে। তারা আরামের চাদরের নিচে ছিল। কারণ এ খাতে ঝুঁকি নেই, লাভ নিশ্চিত। ব্যাংকগুলো রেকর্ড মুনাফা অর্জন, ভালো ডিভিডেন্ড ও বোনাস দিতে পারে। তবে এ বছর ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ করতে হবে। ব্যাংকগুলোর হাতে এখন প্রচুর উদ্বৃত্ত আছে। এক্ষেত্রে সঠিক ঋণগ্রহীতা খুঁজে বের করার জন্য ব্যাংকগুলোকেও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’

মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান বলেও জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি এখনো সন্তোষজনক নয়, ৮ শতাংশে আটকে আছে। এটাকে আমরা ৫ শতাংশের নিচে নামাতে চাই। এজন্য আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। এটা করতেই হবে, কিন্তু কখন হবে, তা জানি না। বিনিময় হার যদি স্থিতিশীল রাখতে পারি, বিশ্ববাজার যদি স্থিতিশীল থাকে এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ যদি বড় আকারে ব্যাহত না হয়, তাহলে লক্ষ্য অর্জন হবেই। আর মূল্যস্ফীতি ১ শতাংশের একটু বেশি কমলেই নীতি সুদহার কমানো শুরু করব। এরই মধ্যে অনেক ঋণগ্রহীতারই সুদহার ১১-১২ শতাংশে নেমে এসেছে।’

বেসরকারি খাতে উল্লেখযোগ্য নীতি সহায়তা দেয়া হয়েছে জানিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ী সমাজকে একাধিক ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করেছি। যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা প্রমাণ করতে পেরেছে, আমরা তাদের সবাইকে চোখ বন্ধ করে সহায়তা দিয়েছি। আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে থাকব। তবে কাজ করছে এমন কৌশলের ওপর অযথা চাপ দেয়া যাবে না। কোনো সিদ্ধান্ত নিলে এটিকে পূর্ণ মেয়াদে কাজ করতে দিতে হবে। আমরা অধৈর্য হয়ে আগেভাগেই সুদহার কমানোর তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নিতে পারি না। এর ফলে বিনিময় হার অস্থিতিশীল হওয়া বা ব্যাল্যান্স অব পেমেন্ট নষ্ট হওয়ার সুযোগ থাকে।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাশরুর রিয়াজ ও জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হাসনাত আলম। তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে নীতিনির্ধারণের আগাম সতর্কসংকেত হিসেবে পিএমআই ব্যবহৃত হচ্ছে। কোথাও এটি জিডিপির প্রবণতা আগেভাগে ধরতে সহায়তা করছে, কোথাও আবার খাতভিত্তিক নীতিসহায়তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও একইভাবে পিএমআই ব্যবহার করে তৈরি পোশাক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, সেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে লক্ষ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা সম্ভব। নিয়মিত ও বিশ্বাসযোগ্য পিএমআই ডাটা বাংলাদেশের স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে।

এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন এমসিসিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম।

আরও